যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এবিভিপি-র ছাত্র-সমর্থকদের বিক্ষোভ ও জমায়েত।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯ আগস্টের অশান্তিকে শুধু SFI ও ABVP-র মধ্যে সংঘর্ষ হিসেবে দেখলে ঘটনার গভীরতা বোঝা যাবে না। এর কেন্দ্রে রয়েছে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন—বিশ্ববিদ্যালয়ে কি সব মতের সমান অধিকার থাকবে, নাকি কয়েকটি বামপন্থী সংগঠনই ঠিক করবে কোন মত গ্রহণযোগ্য এবং কারা ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব করবে?
ঘটনার সূত্রপাত ফ্যাকাল্টি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি স্টুডেন্টস’ ইউনিয়নের একটি সাধারণ সভাকে কেন্দ্র করে। কলকাতা পুলিশের বিবরণ অনুযায়ী, বামপন্থী ছাত্রদের একাংশ একতরফাভাবে ইউনিয়ন গঠনের চেষ্টা করলে ABVP-র দীপ্তিমান কর ও নিখিল দাস তার বিরোধিতা করেন। এরপরই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে এবং দু’জনেই আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। গত ছয় বছর ধরে যেখানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি, সেখানে কোনও একটি গোষ্ঠী কীভাবে নিজেদের সিদ্ধান্তকে সমগ্র ছাত্রসমাজের মত বলে তুলে ধরতে পারে? এই প্রশ্ন তোলা অগণতান্ত্রিক নয়; বরং প্রশ্ন না তোলাই অস্বাভাবিক।
যাদবপুরে দীর্ঘদিন ধরে বাম ছাত্র রাজনীতির প্রভাব রয়েছে। সেই রাজনৈতিক ইতিহাসকে অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু প্রভাব এবং একচেটিয়া কর্তৃত্ব এক বিষয় নয়। বামপন্থী স্লোগানকে যদি মুক্তচিন্তা বলা হয়, তবে জাতীয়তাবাদী বক্তব্যকে প্রতিক্রিয়াশীল বা অবাঞ্ছিত বলে দাগিয়ে দেওয়া যায় না। যে স্বাধীনতা মার্কস, লেনিন কিংবা বিপ্লবের কথা বলার অধিকার দেয়, সেই একই স্বাধীনতা ভারত, জাতীয় ঐক্য এবং দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে কথা বলার অধিকারও দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে যাদবপুরে ABVP-র উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের প্রতিটি বক্তব্য বা পদক্ষেপ প্রশ্নের ঊর্ধ্বে—এমন দাবি করার কোনও কারণ নেই। কিন্তু একটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক একচেটিয়াতন্ত্রের মধ্যে ABVP একটি বিকল্প মতকে সামনে আনছে। তারা এমন ছাত্রদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠছে, যারা বাম রাজনীতির সঙ্গে একমত নয়, অথচ এতদিন সংগঠিতভাবে নিজেদের বক্তব্য রাখার পর্যাপ্ত সুযোগ পায়নি। একটি সুস্থ শিক্ষাঙ্গনে এই বিকল্প কণ্ঠের উপস্থিতি থাকা স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়।
ABVP-র সদস্যদের আহত ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা কোনওভাবেই হালকাভাবে নেওয়া যায় না। মতের বিরোধিতা যুক্তি দিয়ে হওয়া উচিত, শারীরিক আক্রমণ দিয়ে নয়। একইসঙ্গে বহিরাগতদের প্রবেশ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং পাল্টা হামলার যে অভিযোগ উঠেছে, তারও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। জাতীয়তাবাদের পরিচয় বহন করলেই কোনও হিংসাত্মক কাজ গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। আইনের বিচারে প্রত্যেক অপরাধীর পরিচয় একটাই—সে অপরাধী।
কমিউনিস্ট ছাত্র রাজনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখানেই। তারা বহুত্বের কথা বলে, কিন্তু দক্ষিণপন্থী বা জাতীয়তাবাদী মতকে সেই বহুত্বের অংশ হিসেবে সহজে মানতে চায় না। নিজেদের বক্তব্যকে ‘প্রতিবাদ’ এবং বিরোধীদের বক্তব্যকে ‘প্ররোচনা’ বলা গণতন্ত্র নয়। বিশ্ববিদ্যালয় কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতের স্থায়ী দুর্গ হতে পারে না।
এই অচলাবস্থার একমাত্র গ্রহণযোগ্য সমাধান হল অবাধ, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন। নিয়মিত নির্বাচন হলে ছাত্ররাই ঠিক করবে কাদের তারা প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চায়। কোনও সংগঠনকে জোর করে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে না, আবার কোনও সংগঠনকে ভয় দেখিয়ে সরিয়েও রাখা যাবে না।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরব তার শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি ও মুক্ত আলোচনার ঐতিহ্যে—তার দেওয়ালের কোনও নির্দিষ্ট রঙে নয়। ABVP-র উত্থানকে কেবল ‘বহিরাগত হস্তক্ষেপ’ বলে উড়িয়ে দিলে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হবে। এটি সেই ছাত্রদের রাজনৈতিক প্রকাশ, যারা আর বামপন্থী আধিপত্যকে স্বাভাবিক নিয়ম বলে মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। যাদবপুর সকলের—এবং সেখানে জাতীয়তাবাদী কণ্ঠও সমান মর্যাদায় শোনা উচিত।
কলমে: উতঙ্ক ব্যানার্জী