ছবি: Akbarnama-র সঙ্গে সম্পর্কিত মুঘল মিনিয়েচার; হেমুর সৈন্য ও সমর্থকদের মস্তক দিয়ে ‘Tower of Skulls’ নির্মাণের দৃশ্য হিসেবে প্রচলিত, আনুমানিক ১৫৯০।
ছবি-সূত্র: Wikimedia Commons।
লেখক: উতঙ্ক ব্যানার্জি (Utank Banerjee)
১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ সং
ঘটিত হয় মহারাজা হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্য—যিনি ইতিহাসে ‘হেমু’ নামে অধিক পরিচিত—এবং মুঘল বাহিনীর মধ্যে।
যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে হেমুর বাহিনীই এগিয়ে ছিল। দুই দিক থেকেই তাঁর সৈন্যরা সফলভাবে মুঘল বাহিনীকে চাপে ফেলছিল। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে একটি তীর এসে হেমুর চোখে বিদ্ধ হয়। তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। সেনাপতি হারিয়ে তাঁর বাহিনীর মনোবল ভেঙে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।
মৃত্যুপথযাত্রী ও অচেতন অবস্থায় হেমুকে বন্দি করা হয়। বায়রাম খান তাঁর মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেন। বর্ণনা অনুযায়ী, তরুণ আকবরের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে তরবারি ধরিয়ে দেওয়া হয়, যাতে তিনি ‘গাজি’ উপাধি দাবি করতে পারেন। হেমুর মস্তক তাঁর মৃত্যুর প্রমাণ হিসেবে কাবুলে পাঠানো হয় এবং তাঁর দেহ দিল্লির একটি প্রবেশদ্বারে প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা হয়।
কিন্তু হেমুর মৃত্যুতেই প্রতিশোধ শেষ হয়নি।
মুঘল বাহিনী আলওয়ারের সরকার দখল করার পর বর্তমান রাজগড়ের কাছাকাছি মাচেরির দিকে অগ্রসর হয়। সেখানেই হেমুর পরিবারের বসবাস ছিল।
হেমুর পিতা পূরণ দাস ছিলেন একজন পুরোহিত। তিনি সংসার ত্যাগ করে বৃন্দাবনে গিয়ে বল্লভ সম্প্রদায়ের সাধক হরিবংশের সান্নিধ্যে বসবাস করছিলেন। তাঁকে বন্দি করে আকবরের সামরিক কর্মকর্তা পীর মুহাম্মদ খানের সামনে নিয়ে আসা হয়।
পীর মুহাম্মদ বৃদ্ধ পূরণ দাসকে ধর্ম পরিবর্তনের নির্দেশ দেন।
পূরণ দাসের উত্তর ছিল স্পষ্ট—
“আশি বছর ধরে আমি সনাতন ধর্মের বিধান অনুযায়ী বিষ্ণুর উপাসনা করেছি। এখন কেন আমার ধর্ম ত্যাগ করব? শুধু প্রাণের ভয়ে এমন একটি উপাসনাপদ্ধতি কেন গ্রহণ করব, যা আমি বুঝি না এবং বিশ্বাসও করি না?”
এই প্রত্যাখ্যানের উত্তর যুক্তি দিয়ে দেওয়া হয়নি। দেওয়া হয়েছিল সহিংসতার মাধ্যমে।
এরপর প্রতিশোধের লক্ষ্য হয়ে ওঠে ধুসর ভর্গব সম্প্রদায়। হেমুর আত্মীয়, গোষ্ঠীর সদস্য এবং তাঁর সমর্থকদের বিভিন্ন স্থানে অনুসরণ করে হত্যা করা হয়। তাঁদের বিচ্ছিন্ন মস্তক দিয়ে একটি স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছিল বলে বিবরণে উল্লেখ রয়েছে—বিজয়ের স্মারক হিসেবে নয় শুধু, আতঙ্ক ছড়ানোর হাতিয়ার হিসেবেও।
এই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি মুঘল মিনিয়েচার চিত্রে হেমুর সৈন্য ও সমর্থকদের মুণ্ড ব্যবহার করে এমন একটি স্তম্ভ নির্মাণের দৃশ্য দেখানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়। ছবিটি Akbarnama-র একটি পাণ্ডুলিপির অংশ হিসেবে পরিচিত। এর একটি প্রতিলিপি পানিপথের যুদ্ধ-সংগ্রহশালাতেও প্রদর্শিত হয়েছে বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।
এমন মুণ্ডস্তম্ভ কেবল এক মুহূর্তের হত্যাযজ্ঞ ছিল না। পরবর্তী সময়েও এ ধরনের নির্মাণের অস্তিত্বের উল্লেখ পাওয়া যায়। ব্রিটিশ পর্যটক পিটার মান্ডির ভারত-ভ্রমণ সংক্রান্ত বিবরণেও বহু দশক পরে এ ধরনের স্তম্ভ দেখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্যর উত্থান ছিল অসাধারণ। সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে তিনি দিল্লির সিংহাসনে বসেছিলেন। তার আগে আদিল শাহ সুরির প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপতি হিসেবে আফগান বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে তিনি একের পর এক যুদ্ধ করেছিলেন। তাঁর শেষ যুদ্ধের আগে তিনি ২২টি সামরিক সংঘর্ষে অংশ নিয়েছিলেন বলে বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
ঐতিহাসিক আর. সি. মজুমদার লিখেছিলেন—
“এইভাবেই শেষ হল হেমুর সেই মহৎ পরিবারের ইতিহাস—এক মহান হিন্দু, যিনি সাধারণ পরিবারে জন্ম নিয়েও নিজের শক্তিতে দিল্লির সিংহাসনে পৌঁছেছিলেন।”
পানিপথে হেমুর পরাজয় শুধু একজন শাসকের পতন ছিল না। তার পরে তাঁর পরিবার, আত্মীয়, সমর্থক ও ধুসর ভর্গব সমাজের উপর যে প্রতিশোধ নেমে এসেছিল, তা যুদ্ধজয়ের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। বন্দি বৃদ্ধকে ধর্মান্তরের নির্দেশ, ধর্মত্যাগে অস্বীকারের পর হত্যা, বিচ্ছিন্ন মস্তক দিয়ে স্তম্ভ নির্মাণ—এই ঘটনাগুলিকে বাদ দিয়ে সেই সময়ের ইতিহাসকে পরিষ্কার বা রোমান্টিক করে দেখানো যায় না।
আকবরকে নিয়ে ইতিহাসে প্রশাসনিক সংস্কার, সাম্রাজ্য বিস্তার কিংবা পরবর্তী সময়ের ধর্মনীতি নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর ক্ষমতায় আরোহণের সঙ্গে যুক্ত রক্তাক্ত ঘটনাগুলিও একই ইতিহাসের অংশ। সেগুলিকে আড়াল করে কেবল ‘মহান’ সম্রাটের ছবি আঁকা ইতিহাসচর্চা নয়; ইতিহাসের অস্বস্তিকর অংশকে বেছে বেছে ভুলে যাওয়া।
একইভাবে ব্রাহ্মণ সমাজকে নিয়ে আজ যখন নির্বিচারে বিদ্রূপ বা ঐতিহাসিক সাধারণীকরণ করা হয়, তখন ধুসর ভর্গবদের মতো অধ্যায়গুলিও মনে রাখা দরকার। ভারতের দীর্ঘ ইতিহাসে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বহু অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ আক্রমণ, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মুখে নিজেদের পরিবার, সম্পদ এবং জীবন হারিয়েছেন।
ইতিহাসের কোনও সম্প্রদায়ের যন্ত্রণা মুছে ফেলা উচিত নয়। আবার কোনও সাম্রাজ্যের জাঁকজমকের আড়ালে তার সংঘটিত সহিংসতাকেও চাপা দেওয়া উচিত নয়।
হেমুর পরাজয়ের পরে যে মুণ্ডস্তম্ভ দাঁড়িয়েছিল বলে ইতিহাসে বর্ণনা রয়েছে, সেটি শুধু মৃত মানুষের মাথার স্তূপ ছিল না—তা ছিল ক্ষমতার সেই নির্মম ভাষার প্রতীক, যেখানে বিজয়ের ঘোষণা লেখা হয়েছিল পরাজিত মানুষের রক্ত দিয়ে।