কেন বাঙালির হোমল্যান্ড পশ্চিমবঙ্গ? লুকিয়ে রাখার ইতিহাস কী ছিল?
দেশ ভাগ হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। ১৯৪৭ সালের ১৪ অগাস্ট দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিত্বে পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তান ভাগ হয়। মুসলিমলীগের বড় স্বপ্ন ছিল সাংস্কৃতিক শহর কলকাতা পাকিস্তানের রাজধানী হবে। ১৯৪৬ সালের ১৬ অগাস্ট কলকাতায় ডাইরেক্ট অ্যাকশেন ডে পালন করেছিলেন জিন্না এবং মুসলিমলীগ। হিন্দুদের ওপর কালোদিন নেমে এসেছিল, ১৬, ১৭, ১৮ অগাস্টে। খোদ কলকাতায় প্রায় ১০০০০ হিন্দুকে হত্যা করেছিল মুসলিমলীগের নেতারা। তৎকালীন বঙ্গের প্রধানমন্ত্রী হোসেন সুহরাবর্দী কসাইয়ের মতো আচরণ করেছিলেন। লালবাজার কন্ট্রোলরুমে বসে সবটা পরিচালনা করেছিলেন। শুধু তাই নয়, ওই বছরেই কলকাতা দাঙ্গার প্রভাব পড়েছিল পূর্ববঙ্গের নোয়াখালি, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও বরিশালে। ১০ অক্টোবর কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোরদিন নোয়াখালি, বরিশালে ব্যাপক ভাবে হিন্দুদের নিধন করেছিল কট্টর মুসলিমরা।
১৯৪১ সালের গণনায় বঙ্গের মোট হিন্দুদের পরিমাণ ছিল ৪৫ শতাংশ। ১৯৪৭ সালে পূর্ববঙ্গে হিন্দুদের শতাংশ ছিল ২২ শতাংশ, পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের শতাংশ ছিল ১৯ শতাংশ। কিন্তু বর্তমানে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ হিন্দুদের পরিমাণ ৮ শতাংশের নিচে আর পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের পরিমাণ প্রায় ৩০ শতাংশের বেশি। ফলে জনবিন্যাস বদলে গেলে নির্ণায়ক সিদ্ধান্ত কাদের হাতে যাবে তা অনুমেয়। স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গে যুক্তফ্রন্ট, বামফ্রন্ট, তৃণমূলের শাসনে হুমায়ূন, শাহজাহান, জাহাঙ্গীর, ববি হাকিম, সিদ্দিকুল্লাদের তৈরি করেছে। দাওয়াত-এ ইসলাম পশ্চিমবঙ্গের জন্য ভীষণ সঙ্কট জনক হয়ে পড়েছে। মুসলিম আগ্রাসী মনোভাব হিন্দুদের জন্য ভীষণ ভাবে সঙ্কটের।
এবার ফিরে যাই ১৯৪৬-৪৭ সময় পর্বে, সেই সময় পূর্ববঙ্গে হিন্দুদের অস্তিত্ব রক্ষা কতটা সঙ্কট জনক হবে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। তাই ১৯৪৭ সালের ৪, ৫, ৬ এপ্রিল হুগলী জেলার তারকেশ্বরে বাঙ্গীয় হিন্দু মহাসভার সভা বসেছিল। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গকে মুসলিমলীগের প্রস্তাবিত পাকিস্তান থেকে বঙ্গকে আলাদা করে হিন্দুদের সুরক্ষিত ভূমি পশ্চিমবঙ্গ গড়তে হবে। সেই সময় শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কার্যকারী তৎকালীন বঙ্গীয় হিন্দু মহাসভার সভাপতি নির্মল চন্দ্র চ্যাটার্জি, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, সনৎ কুমার রায় চৌধুরী, সূর্য কুমার বসু সহ আরও অনেকে। অবশেষে ওই বছর ২০ শে জুন পশ্চিমবঙ্গকে ভারতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ভোটাভুটিতে পক্ষে এবং বিপক্ষে মোট ভোট পড়েছিল ৫৮ এবং ২১টি। তৎকালীন বাঙালি হিন্দুর সুরক্ষায় মেঘনাদ সাহা, আচার্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, শিশিরকুমার মিত্র, রমেশ চন্দ্র মজুমদার এবং যদুনাথ সরকার সহ প্রমখ ব্যক্তিত্ব একবাক্যে ভারতে অন্তর্ভুক্তিকরণকে সমর্থন করেছিলেন। এই কাজে আরও বিশেষ ভূমিকা ছিল ভারত সেবাআশ্রমের সন্ন্যাসী স্বামী প্রণবানন্দ মহারাজের। বঙ্গে তৎকালীন হিন্দু রাজাদের মধ্যে ছিলেন বর্ধমানের রাজা উদয়চাঁদ মহাতাব, কাশিমবাজারের মহারাজ শ্রীশচীন্দ্র নন্দী, মহারাজা প্রবেন্দ্রমোহন ঠাকুর, শিতাংশকান্ত আচার্যচৌধুরী। একই ভাবে বঙ্গের কংগ্রেসের নেতারাও বুঝেছিলেন পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের মধ্যেই রাখতে হবে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ক্ষিতীশচন্দ্র নিয়োগী, নলিনীরঞ্জন সরকার, ডাঃ পিএন বন্দ্যোপাধ্যায়, অতুল চন্দ্র গুপ্ত, মাখনলাল সেন, এবং ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের মতো মানুষ সমর্থন করেছিলেন।
১৯০৬ সালে ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ, নওয়ার ভিকারুল মুলক, আগাখান প্রত্যক্ষ ভাবে নেতৃত্ব দিয়ে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে মুসলিম লীগের স্থাপনা করেছিলেন। তাঁদের স্পষ্ট দাবি ছিল মুসলিম স্বার্থ এবং মুসলিম ভুখণ্ড। জনবিন্যাস, জনবিস্ফোরণনীতি বঙ্গের ইতিহাসে ধর্মীয় বিভাজন এবং দেশভাগকে একেবারে কট্টর বাস্তবতার সামনে নিয়ে গিয়েছে। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের, অস্তিত্ব, নির্যাতন, ধর্মীয় সঙ্কট সবটা মিলিয়ে এক কালো অন্ধকার নেমে এসেছে। হিন্দুদের হাজার হাজার বছরের পুরাতন ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতি এখন গভীর সঙ্কটের মুখে।
পশ্চিমবঙ্গ যাতে জেহাদি কট্টর মৌলবাদের হাতে চলে না যায় তাই ইতিহাস, জাতির সঙ্কট এবং সমস্যাকে বাস্তবতা দিয়ে তুলে ধরার জন্য পশ্চিমবঙ্গ দিবসকে ভালো করে জানা দরকার। আজকের প্রজন্ম এবং আগামী প্রজন্মকে বাঙালির প্রকৃত ইতিহাসকে জানা একান্ত আবশ্যক। ইতিমধ্যে জাতীয়তাবাদী নানা সামাজিক সংগঠন এবং হিন্দুত্ববাদী একাধিক মঞ্চের তরফে পশ্চিমবঙ্গ দিবসের কথা নানা রকম কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে করে আসছিল। তাতে সংখ্যায় কম হলেও হিন্দু হোমল্যান্ড রক্ষার আগুন ভিতরে ভিতরে ব্যাপক ভাবে ছিল।
২০২১ সালে তৎকালীন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা তথা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বাইরে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির প্রতিকৃতিতে মালা দিয়ে প্রথম বারের মতোই স্বাধীনতা উত্তর বিধানসভায় পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালনের চেষ্টা করেন। উল্লেখ্য পরের বছর তৎকালীন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস এই পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।
ব্রিটিশদের বড় চক্রান্ত এবং জেহাদিদের ইসলামিক রাষ্ট্র নির্মাণের কুচক্র বঙ্গের ভূমিখণ্ড নানা সময়ে নানা ভাবে বিভাজিত হয়েছে। শেষ ভূখণ্ড পশ্চিমবঙ্গকে হিন্দুদের স্বার্থে না রাখতে পারলে গোটা বিশ্বের মানচিত্রে হিন্দুবাঙলীরা পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত উদ্বাস্তু থেকে যাবে। তাই আগামী প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে এবং হিন্দু ধর্মের অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখতে ‘পশ্চিমবাংলা’ নয় “পশ্চিমবঙ্গ”-কে ভালো করে জানা-বোঝা একান্ত প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গ নামের মধ্যেই এক গভীর ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে। একবার প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু দেশ বিভাজন এবং জাতীয় বিভীষিকা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “দেশভাগের কথা প্রকাশ্যে আনলে সম্প্রীতি নষ্ট হবে।” কিন্তু কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে দ্বিজাতিতত্ত্ব, পাকিস্তান প্রস্তাব, মৌলবাদী জেহাদিদের দাঙ্গা এবং হিন্দু জনজীবনের অস্তিত্বের সংগ্রামের কথা পাঠ্যপুস্তকে অবশ্যাই আনা দরকার। কারণ যে জাতি ইতিহাস ভুলে যায় একদিন তারই ইতিহাস থাকে না। পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুরা আছেন বলেই ধর্মনিরপেক্ষ, সেকুলার শব্দের প্রয়োগ রয়েছে। অন্যথায় পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশ আমাদের চোখের সমানেই দৃষ্টান্ত। হিন্দু বাঙালির আর জায়গা নেই। তাই উন্নয়নের চেয়ে সুরক্ষা আগে জরুরি।
কলমে...ডক্টর সুমন চন্দ্র দাস