বিজন সেতু গণহত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড এখনও জীবিত! কবে ন্যায় বিচার পাবে আনন্দমার্গী সন্ন্যাসীরা
বিজন সেতু গণহত্যা একটি স্বাধীনতা উত্তর পশ্চিমবঙ্গে একটি ঐতিহাসিক কালাঅধ্যায়। ১৯৮২ সালের ৩০ এপ্রিল ঘটনাটি ঘটেছিল। এদিন আনন্দমার্গী ১৬ জন সন্ন্যাসী এবং ১ জন সসন্ন্যাসিনীকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এই হামলা হয়েছিল প্রকাশ্য দিবালোকে। হাড়হিম করা এই হত্যাকাণ্ড গোটা সভ্য সমাজকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। যখন ঘটেছিল তখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জ্যোতিবসু। হত্যাকারীদের কোনও রকম ভাবে গ্রেফতার করা হয়নি। এই পাশবিক হিন্দু হত্যার পিছনে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে ছিল তৎকালীন সিপিআইএমের নেতারা। কিন্তু যেহেতু শাসক দলের ইশারারেই পরিকল্পনা করেই খুন করা হয়েছিল তাই আজ হত্যাকারীদের শাস্তি হলনা। রাজ্যের ২০১১ সালে পালাবদলের পর তৃণমূল ক্ষমতায় এলেও নামে মাত্র লালা কমিশন বসলেও দোষীদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ হয়নি।
ঘটনা ঘটেছিল দিনেদুপুর বেলায়। সেই সময় কলকাতার তিলজলায় আনন্দ মার্গের একটি সদর দফতর ছিল। সেই দফতরে ট্যাক্সিতে করে সন্ন্যাসী এবং সন্ন্যাসীরা একটি শিক্ষা বিষয়ক সম্মলনে যোগদান করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু আচমাকই রাস্তায় গাড়ি আটকে জোর পূর্বক নামিয়ে তাঁদের পিটিয়ে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। এরপর মৃতদেহকে আলাদা আলাদা তিন জায়গায় নিয়ে গিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। উল্লেখ্য এই হত্যার ঘটনা যখন ঘটেছিল সেই সময় রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের চোখের সামনেই এই ধরনের হত্যালীলা চালানো হয়।
দুষ্কৃতীরা শিশুচোর গুজব তুলেছিল
ঘটনা ঘটে যাওয়ার মোট ১ সপ্তাহ পরে ১৯৮২ সালেই কলকাতার একটি নামি সংবাদ পত্রিকা দ্যা স্টেটসম্যান সাপ্তাহিক রিপোর্টে স্পষ্ট করে বলা হয়, “৩০ এপ্রিল সকালে দক্ষিণ কলকাতার তিনটি জায়গায় দুষ্কৃতীরা শিশুচোর গুজবে মোট ১৭ জন আনন্দমার্গীকে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়। উল্লেখ্য তাঁদের মধ্যে ২ জন মহিলাও ছিলেন।” এই পাশবিক ঘটনায় বিন্দুমাত্র সহানুভূতি জানাতে দেখা যায়নি। ক্ষতিপূরণ তো দূরের কথা ন্যূনতম মানবিক আবেদন প্রকাশ করতে দেখা যায়নি। তৎকালীন বাম সরকার এবং গণমাধ্যমের ভাষায় এই নির্মম ঘটনার কোনও প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। গোটা সমাজব্যবস্থার নগ্নরূপ সেই দিন লক্ষ্য করা গিয়েছিল।
অত্যন্ত পাপ কাজ
তবে ওই বছরের পরের মাস ৫ মে স্টেটসম্যান এবং রবিবারের ইন্ডিয়াটুডে পত্রিকায়ও কিছু কিছু এই নারকীয় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সময়ের দেশের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, “পুলিশের প্রক্রিয়া আরও উন্নত করা যেতো। সরকার আনন্দ মার্গের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করছে।” বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ নরসিংহ শিল তাঁর গবেষণায় বলেছেন, “অত্যন্ত পাপ কাজ হিসবে প্রতিপন্ন করায় এবং বিদ্বেষপূর্ণ হওয়ায় নিজেদের হত্যা করেছে।” আবার ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “নিহতদের মধ্যে ২ জন সন্ন্যাসীকে রেল স্টেশনের কাছে একটি শিশুকে বহন করতে দেখা গিয়েছে।” যদিও স্থানীয় তিলজলা থানার পক্ষ থেকে সন্ন্যাসীদের কোনরকম শিশুঅপহরণের মামলা দায়ের করেনি।
জ্যোতিবসুর ভূমিকা ছিল সন্দেহজনক
জ্যোতিবসু সরকার এবং রাজ্যপুলিশের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সন্দেহজনক। তাঁদের ভূমিকা দোষীদের বিপক্ষে নয় পক্ষেই ছিল। পরে অবশ্য চাপে পড়ে দেব কমিশন গঠন করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবসু। পরবর্তী সময়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন তদন্ত শুরু করে কিন্তু বাম সরকারের চূড়ান্ত অসহযোগিতায় কমিশনের তদন্তের গতি খুব বেশিদূর এগোতে পারেনি। জানা গিয়েছে যে তদন্তকারী অফিসার তদন্ত করছিলেন গঙ্গাধর ভট্টাচার্যকেই গুলিকরে হত্যা করেছিল সিপিআইমের দুষ্কৃতীরা।
পরে ১৯৯৯ সালে আনন্দমার্গ প্রচারক সঙ্ঘের সন্ন্যাসীদের গণহত্যার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে কর্মরত একজন বিচারকের তত্ত্বাবোধনে মামলার তদন্তের দাবি জানায়। পরে ৩০ এপ্রিল ২০০৪ সালে আনন্দমার্গ প্রচারক সঙ্ঘের পক্ষ থেকে প্রথম আদালতের অনুমতি ছাড়াই প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে। এরপর থেকে প্রতিবছর এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা হয়।
২০১১ সালের পর রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি অমিতাভ লালার তত্ত্বাবোধানে তদন্ত কমিশন গঠন হয়। এরপর ২০১২ সালের মার্চ মাসে একটি আনুষ্ঠানিক ভাবে বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন হয়। গণহত্যা নিয়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবসু বলেছিলেন, “কি করা যেতে পারে এমন ঘটনা ঘটে।”
কান্তি গাঙ্গুলি, শচীন সেন অভিযুক্ত
এই কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী জানা গিয়েছে, কসবা-যাদবপুর এলাকার বেশকিছু প্রভাবশালী সিপিআইএম ১৯৮২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারিতেই পিকনিক গার্ডেন এলাকার কলোনি বাজারে আনন্দ মার্গীদের নিয়ে একটি আলোচনা হয়েছিল। এই আলোচনায় বামফ্রন্টের মন্ত্রী কান্তি গাঙ্গুলি, শচীন সেন, প্রাক্তন স্থানীয় সিপিআইএম বিধায়ক নির্মল হালদার, স্থানীয় সিপিআইএম নেতা অমল মজুমদার, ১ নং ওয়ার্ডের প্রাক্তন কাউন্সিলর উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। ১০৮ তিলজলা-কসবা এলাকায় যাদবপুরের তৎকালীন সাংসদ ছিলেন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। তিনিও সভায় আমন্ত্রিত ছিলেন। আনন্দ মার্গীরা যেহেতু একটি ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক সংগঠন তাই তাঁদের সঙ্গে সিপিআইএমের মতাদর্শগত বিরোধীতা ছিল। হিন্দু ধর্মীয় আদর্শকে বামপন্থীরা তীব্র ঘৃণা করতেন। তাই তাঁদেরকে দমন করারকাজকে সুচারু ভাবে করা হয়েছে। সকল অনুমান এবং তথ্যকে উদঘটন করে প্রকৃতদোষীদের চিহ্নিত করা কেন গেল না ? সেই প্রশ্ন আজও মানুষের মনে মনে ঘুরপাক করছে।
ছেলে ধরার প্রমাণ মিলেনি
এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বরুদ্ধে তৎকালীন বামসরকার হত্যার দিন থেকেই নিষ্ক্রিয় ছিল। যুগান্তর পত্রিকায় লেখা হয়েছে, “ধরে ধরে ১৭ আনন্দমার্গীকে খুন, কসবায় নরমেধ।” আনন্দ বাজারপত্রিকায় লেখা হয়েছে, “রাজনৈতিক হত্যা এই রাজ্যে বেনজির” বলেছেন ইন্দিরা গান্ধী। স্টেটসম্যানে লেখা হয়েছে, “7th march killed in Mob Fury”
শচীন সেন ছিলেন সিপিআইএমের বিধায়ক। তাঁর ভয়ে পার্টির কেউ কথা বলতো না। এই ব্যক্তি নেতৃত্ব দিয়েছেন গোটা হত্যাকাণ্ডে।
তুষার ভট্টাচার্য বিষয়টি নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে সাক্ষাৎকারে ত্রম্বকেশ্বর অবধূত সন্ন্যাসী বলেন, “দুজন সন্ন্যাসিনীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাঁদের সঙ্গে দুজন বাচ্চা ছিল। ছেলে ধরা হিসেবে অপবাদ দেওয়া হয়েছিল। ধরে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সিপিএমের বিধায়ক সচিন সেন।” সর্বেশ্বরা অবধূত বলেন, “সচিন সেন কমরেডদের নিয়ে মিটিং করেছেন। আনন্দমার্গীদের নাম নিয়ে প্রচার করা হয় তাঁরা ছেলে ধরা। পরিকল্পনা করে হাওয়া তোলা হয়। কিন্তু সন্ন্যাসীরা ছেলে ধরে নিয়ে গিয়েছেন তেমন কোনও প্রমাণও পাওয়া যায়নি।”
অবধূতিকা আনন্দা শুভচেতনা সন্ন্যাসিনী বলেন, “আমদের সঙ্গে বাচ্চা মেয়ে ছিল। সে নিজেই হিন্দিতে বলছে আমি দিদির কাছে ছোট বেলা থেকে রয়েছি। এরপর দুষ্কৃতীরা বলে ব্যাগের ভিতরে বাচ্চা রয়েছে খুঁজে দেখ।”
হিন্দু সাধুদের চরম বিদ্বেষী ছিল বামেরা
পুরুলিয়ার জয়পুরের মহারানী প্রফুল্লকাননী ১৯৬২ সালে আনন্দমর্গীদের আশ্রমের জন্য জমি দান করেন। ১৯৬৭, ৫ই মার্চ এই আশ্রমে আক্রমণ করে মোট ৫ জন সন্ন্যাসীকে হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৯৫ সালে আশ্রমের পরিচালক সন্ন্যাসী আচার্য অনির্বাণ ব্রহ্মচারীকে জমি দখলের নামে নির্মম ভাবে বেঁধে হত্যা করে সিপিআইএম-এর দুষ্কৃতীরা। কেবলমাত্র গৈরিক বসন এবং হিন্দু ধর্মাচার পালনের জন্য পার্টির গুন্ডারা জলে ডুবিয়ে হত্যা করে। ডামরুঘুটুর রাধে সরেনকে রাস্তায় ফেলে হত্যা করা হয়। সিপিএম যখন রমরমা ছিল সেই সময় নিজেদের দৌরাত্ম্যকে প্রকাশ করেছে সন্ন্যাসীকে হত্যা করে।
কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত নিজে “এই বিপদ রুখতে হবে” বলে সিপিআইএমের রাজ্য কমিটি থেকে পুস্তক প্রকাশ করা হয়। সেখানে আনন্দ মার্গীদের সম্পর্কে বলা হয়, “ধর্মের আড়ালে অগ্র সাম্প্রদায়িকতাকে প্রচার প্রসার করছে। তাই আটকাতে হবে। বিদেশী প্রতিক্রিয়াশীলদের অর্থে চলে।”
৩০ শে এপ্রিলের মাস তিনেক আগে ৬ ফেব্রুয়ারি ডাকা হয় নাগরিক কনভেনশেন। উদ্দেশ্য ছিল কঠোর ভাবে সচেতন করা। স্থান ছিল আনন্দ আরতি হল, পিকনিক গার্ডেন রোড, তিলজলা আর দিন ছিল শনিবার বিকেল ৫টা। একটি প্রচারপত্র প্রকাশ করা হয়েছিল। তাতে লেখা ছিল, “বৈদেশিক শক্তির সহায়তায় দেশীয় প্রতিক্রিয়াশীল ব্যক্তি সমাজ ও রাজনৈতিক জীবনে চরম অস্থিরতা সৃষ্টির অপ চেষ্টায়রত প্রিক্রিয়াশীল চক্রের মধ্যে আনন্দমার্গ অন্যতম। আমরা মনের করি মানুষের স্বার্থে এই ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ একান্ত প্রয়োজন।” প্রচারপত্রের আবেদনকারীদের মধ্যে ছিলেন সাংসদ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়, সন্তোষ মিত্র, বিধায়ক সচিন সেন, ক্ষুদিরাম ভট্টাচার্য, গঙ্গাধর নস্কর এবং কান্তি গাঙ্গুলির নামও। এই প্রচারপত্রটি প্রকাশিত হয়েছিল বাবলু চক্রবর্তীর নামে। ১৯৮২ সালে সিপিআইএমের মুখপত্র গণশক্তি পত্রিকায় বক্তৃতায়রত সাধন গুপ্ত, সচিন সেনের ছবি দিয়ে এই কনভেনশনের ছবি ও রিপোর্ট আকারে প্রকাশ করা হয়েছিল। রিপোর্টে খুব স্পষ্ট করে বলা হয় এলাকায় আনন্দমার্গীদের বিরুদ্ধে আপনারা এগিয়ে আসুন। সবরকম প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের ডাক দেওয়া হয়। বিনা বাধায় যদি কাজ করতে দেওয়া হয় তাহলে আগামী দিনে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ক্রমবর্ধমান অশুভ তৎপরতার বিরুদ্ধে মানুষ সচেতন হচ্ছেন। বিনা বাধায় তাদের কাজ এগিয়ে চলছে তাই প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু প্রতিরোধের ধরন কেমন হবে তা স্পষ্ট করে বলা হল না।
ক্যাডাররা ছেলে ধরা ছেলে ধরা বলে স্লোগান দিয়েছিল
৩০ শে এপ্রিল ১৯৮২ সালে তিলজলার আনন্দ আশ্রমে ছিল বাৎসরিক ধর্ম সম্মেলন। সারা দেশবিদেশ থেকে আনন্দমার্গের সাধু সন্ত এবং সন্ন্যাসীরা আসবেন এই দিনে। অপর দিকে চলছিল আরেক গোপন প্রস্তুতি। বণ্ডেল গেট এবং বিজন সেতুকে ঘিরেই প্রস্তুতি চলছিল দুর্বৃত্তদের। আগের দিন বিকেলে ২৯ এপ্রিল থেকেই সিপিআইএমের ক্যাডাররা ছেলে ধরা ছেলে ধরা বলে স্লোগান দিতে দিতে উত্তপ্ত করে এলাকা।
পরদিন সকালে ধর্ম সম্মলেনে যোগদান করতে হাওড়া স্টেশন থেকে ট্যাক্সিতে করে আশ্রমে আসতে শুরু করেন। তখন মেট্রো পলিটন ইএম বাই পাস নির্মাণ হয়নি। সন্ন্যাসীদের ট্যাক্সি বন্ডেল গেট এবং বিজন সেতুর মধ্যে দিয়ে যেতে এগিয়ে যায়। প্রথমে ১০-১২ জন তরুণ ছেলে লাঠি অস্ত্র নিয়ে গাড়ি থেকে টেনে হিঁচড়ে নামায়। সন্ন্যাসীরা না নামতে চাইলেও জোর করে নামানো হয়। এরপর একজন ছুটে দৌড়ে পালাতে গেলে রড দিয়ে আঘাত করে মাটিতে ফেলে দেয়। এরপর গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়। সন্ন্যাসী কমলেশ্বরনন্দকে ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করে থেথলে হত্যা করা হয়। হামলায় আঘাত প্রাপ্ত শাশ্বতী মুখোপাধ্যায় বলেন আশেপাশের মহিলারা হাতে লাঠি, কাঠ, মুগুর নিয়ে আমাদের প্রথমে মাধর করে। এরপর জামা ছিঁড়ে দেয়। হাতে রাখা টাকার ব্যাগ ছিনতাই করে নেয়। ব্যাপক মারধরের পর বেশ কয়েকজনকে পেট্রোল দিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। গুরুতর আহতদের ডিজেল-পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। মারতে মারতে রেল লাইনের ধারে পর্যন্ত নিয়ে চলে গিয়েছিল। দুষ্কৃতীরা কেউ কেউ বলছে পার্টি অফিসে নিয়ে চল। থানায় নয়। আমরাই বিচার করব।
ঘটনার নিন্দা জানিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন আশাপূর্ণা দেবী, অন্নদাশঙ্কর রায়, ডক্টর প্রতুল গুপ্ত, মৈত্রী দেবী, শৈবাল গুপ্ত, অম্লান দত্ত, গৌর কিশোর ঘোষ, নির্মল ভট্টাচার্য, সত্যজিত রায়, বিনয় দাসগুপ্ত, সৌমেন বসু প্রমুখ। দেশপ্রিয় পার্ক থেকে বিজন সেতু পর্যন্ত মৌন মিছিল করা হয়েছিল। কিন্তু ঘটনাস্থলে ১৪৪ নম্বর ধারা জারি হওয়ায় বিজন সেতুর আগেই ফুল মালা দিয়ে শোক প্রকাশ করা হয়।
তিলজলা থানার ওসি গঙ্গাধর ভট্টাচার্জকে খুন
ঘটনার প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে মেইনস্ত্রীম উইকলির সম্পাদক সুমিত চক্রবর্তী বলেন, “ঘটনার পিছনে কারা ছিল? শাসক দলের নেতা সমর্থকরাই ছিল। সরকার এবং সরকারি মদতপুষ্ট লোকেরাই এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে ছিল।” আবার “অনীক” পত্রিকার সম্পাদক দীপঙ্কর চক্রবর্তী বলেছেন, “তিলজলা থানার ওসি গঙ্গাধর ভট্টাচার্জকে খুন করা হয়েছে, তদন্তকে প্রভাবিত করা হয়েছে শাসকের দ্বারা। বিরোধীরা ক্লীব, দাঁড়ানোর জায়গা ছিল না।” সরকারের বিরুদ্ধে গেলে কি হতে পারে সেই চিত্রটা দেখিয়েছে বিজন সেতু হত্যাকাণ্ড। আনন্দমার্গের পক্ষ থেকে ৫ টি কেস দায়ের করে সিপিআইএমের বিরুদ্ধে। মূল অভিযুক্ত হিসেবে সিপিএমের নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছিল। যদিও পুলিশ সকলের নাম বাদ দিয়ে ঠেলাওয়ালা, পথচারীদের গ্রেফতার করেছিল। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কেউ জড়িত ছিলনা।
মিচকে বাবলু, গুরুপদ বাগচি, চিন্ময় হাজরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। এরপর পুলিশ তদন্তের নামে প্রহসন চলছিল। পরে আনন্দমার্গীরা সাক্ষী দেওয়া থেকে বিরত হন। পরে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু তদন্ত কমিটি ঘোষণা করেন। আন্দোলনকে কমিশনের নামে দমন করে দেওয়া হয়।
অবিভক্ত ২৪ পরগনার অতিরিক্ত জেলা শাসক শের সিং স্পষ্ট করে বলেছিলেন, “দল এবং সরকারের উচ্চপদস্থ নেতা এবং মন্ত্রীরা ভালো ভাবেই জানতেন। খুব ঠাণ্ডা মাথায় এই হত্যার ঘটনা ঘটানো হয়েছিল।” যদিও তাঁকে অনেক রকম ভাবে হুমকির শিকার হতে হয়েছিল। গোটা পরিকল্পনার পিছনে ছিল কান্তি গাঙ্গুলি।
হাইকোর্ট বইয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধকতা
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ১৯৯০ সালে তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ “আনন্দমার্গের কার্যক্রম এবং হিংসার ইতিহাস” বই প্রকাশ করেন। এরপর আশ্রমের পক্ষ থেকে এই কাল্পনিক সাজানো ঘটনার বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে ১০ কোটি মামলা করা হয়। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ছিলেন তথ্যমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবসু এবং সরস্বতী প্রেসের বিরুদ্ধে আচার্য কৃষ্ণেশ্বরানন্দ অবধূতর মানহানির মামলা করেন। এরপর আর কোর্টের দিকে যাননি তাঁরা। মামলা এখনও চলেছে। হাইকোর্ট বই প্রচারের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ জারি করেছিল। প্রকাশ করা হয়নি দেব কমিশনের রিপোর্ট। বামপন্থীরা এই ভাবেই শাসন চালায় বাংলায়। এই অধ্যায় এক কালা অধ্যায়।
লেখক ডক্টর সুমন চন্দ্র দাস