ভারতের নবজাগরণের প্রাণকেন্দ্র ছিল বাংলা। দুটি ঘটনা বাংলার চেতনার ভাগ্যকে আলোরিত করেছিল। যে আলোরণ ঢেউয়ের মত ধীরে ধীরে সারা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে উজ্জীবিত করেছিল।
ইংরেজ সরকার ১৯০৪ সালে ইন্ডিয়ার ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট ঘোষণা করে। ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বাদের উপর কুঠারাঘাত ছিল বঙ্গভঙ্গ। এই দুটি সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত শিক্ষিত দেশের প্রবুদ্ধজনকে অস্থির করে তুলেছিল। বঙ্গভঙ্গকে কেবল বাংলার বিষয় না ভেবে, এই বিভাজনের কূটচক্রান্তের বিরুদ্ধে সারা ভারতবর্ষ গর্জে উঠেছিল। প্রতিবাদে দেশভক্ত সমস্ত মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন, পাঞ্জাবে, মহারাষ্ট্র থেকে সুদূর দক্ষিণভারতে।
গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৬ সালে কলকাতায় দুটি স্থানে একই বক্তৃতা দিয়েছিলেন। পরে সেটি "স্বদেশী সমাজ” নামে পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়েছিল।
এই "স্ব”-এর ভাবনা সমাজের আলোক প্রাপ্ত অংশে স্পন্দন তুলেছিল। স্ব-শিক্ষা, স্ব-ভাষা, স্ব-শিল্প, স্ব-অর্থনীতি আর স্ব-সংস্কৃতি ইংরেজের চক্রান্তের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসাবে উঠে আসতে থাকে।
এই পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ছিল সাম্রাজ্যবাদী শিক্ষার সমান্তরালে স্বদেশী শিক্ষা ব্যবস্থা। ইংরেজ শিক্ষার মূল ভাবই ছিল বিদেশী প্রভুর প্রতি আনুগত্য। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে গোলদীঘি, দেশপ্রেমিক বিচ্ছুজ্জনদের তীর্যক ভাষায় বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠল "গোলদীঘির গোলামখানা"। প্রতিষ্ঠা হল জাতীয় শিক্ষা পরিষদ বা ন্যাশেনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশন, বেঙ্গল।
সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ভবানীপুরে শুরু করলেন "ভাগবত চতুষ্পাঠী"। সালটা ছিল ১৮৮৫। সেই স্বদেশী শিক্ষানীতির প্রভাতক্ষণে সতীশচন্দ্র ১৮৯৭ সালে "ডন" পত্রিকা প্রকাশ করলেন। ১৯০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হল "ডন সোসাইটি"।
সতীশচন্দ্রে এই স্বদেশী শিক্ষার প্রয়াস যেন ইন্ডিয়ান ইউনিভার্সিটি এক্ট, ১৯০৪ এবং ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত হঠাৎ দ্রুত গতিশীল হয়ে উঠল। ১৯০৫ সালের ১০ ডিসেম্বর পার্ক স্ট্রিটে সংগঠিত হল ল্যান্ড হোন্ডারিস সোসাইটির বৈঠক। সেই বৈঠকে উপস্থিত প্রায় ১৪০০ সদস্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অরবিন্দ ঘোষ, রাজা সুবোধচন্দ্র মল্লিক, এবং ব্রজেন্দ্র কিশোর রায়চৌধুরী ও বিভিন্ন মনীষিরা। রাজা সুবোধচন্দ্র মল্লিকের দেওয়া ১ লক্ষ টাকা নিয়ে শুরু হল পথ চলা। তৈরী হল ন্যাশেনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশন, বেঙ্গল (N. C. E. Bengal) ।
রাসবিহারী ঘোষ নির্বাচিত হলেন পরিষদের প্রথম সভাপতি। তৈরী হল বেঙ্গল ন্যাশান্যাল কলেজ আর বেঙ্গল টেকনিকাল ইন্সটিটিউট।
অরবিন্দ ঘোষ বরদার মহারাজের উচ্চ বেতনের চাকরি ছেড়ে মাত্র ২৫০ টাকা সম্মান দক্ষিণা নিয়ে বেঙ্গল ন্যাশেনাল কলেজের অধ্যক্ষ হলেন।
দেশ, দেশমাতৃকা আর দেশপ্রেম, সেদিন কলকাতায় পূণ্য মৃত্তিকা রাষ্ট্রভক্তির পূজাবেদী হয়ে উঠেছিল। সারা ভারতবর্ষ থেকে যুবকরা দেশভক্তির পাঠ নিতে কলকাতায় আসতেন। সেইসব বিশুদ্ধ কাঁচা লোহাকে অগ্নিযুগের বিপ্লবের গনগনে আগুনে গড়েপিষ্ঠে ঝকঝকে ইস্পাতে রূপ দিতে ঢাকা থেকে কলকাতায়। অনুশীলন সমিতি গঠন করার জন্য এলেন পুলিন বিহারী দাস। ছাত্রদের সামনে এক অদ্ভুত সমন্বয় মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ অরবিন্দ লিখছেন যুগান্তর কর্মযোগীন আর বন্দেমাতরম্ পত্রিকায়। অনুশীলন সমিতিতে জীবন রচনা, জাতীয় শিক্ষা পরিষদে শিক্ষা আর দেশগঠনের সঙ্কল্প এই ছিল অগ্নিযুগের তরুণের স্বপ্ন।
এই দেশাত্মবোধক ভাবনা থেকেই বেঙ্গল টেকনিকাল কলেজ ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয়ে ওঠে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাই ভারতবর্ষে দেশপ্রেম, স্বদেশ আর স্বদেশীই ছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মস্বর। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও একদল দেশপ্রেমিক, নিস্বার্থ, কঠোর পরিশ্রমী শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়কে ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করে তুলেছিলেন।
ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকালিটর এক একটি বিভাগকে এমনই অতি যত্নে তৈরী করা হয়েছিল। প্রযুক্তির বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞান ও কলা বিভাগের অঙ্গনও পুষ্পপল্লবে ভরে ওঠে।
প্রযুক্তির পাঠে ল্যাবরেটারি, কর্মশালা আর বাস্তব প্রযোগের প্রশিক্ষণের মধ্যে দিয়েই বিশ্বামানের শিক্ষা সম্ভব। অধ্যাপক ত্রিগুণা সেন, অমিতাভ ভট্টাচার্য, গোপালচন্দ্র সেনের মত প্রবাদ প্রতিম শিক্ষকদের আন্তরিক প্রয়াসেই আজকের গৌরবময় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শ্রেষ্ঠত্বের শীর্ষে পৌঁছেছে।
এই পর্যায়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক গোপাল চন্দ্র সেন। মহাত্মা গান্ধীর ডাকে স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষ রূপে অংশগ্রহণ করেছিলেন, পূর্ববঙ্গের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের যে ছেলেটি, তিনি নিজের মেধা আর অধ্যাবসায়ে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের থেকে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে আসেন।
জাতীয় শিক্ষা পরিষদের মহাবিদ্যালয়ের প্রথম অধ্যক্ষ ঋষি অরবিন্দ বলেছিলেন, সারা পৃথিবীর থেকে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান আহরণ করে দেশের কল্যাণে লাগানোর জন্য স্বদেশে ফিরে এস। যেন খানিকটা সেই ডাকেই সাড়া দিয়েই গোপাল চন্দ্র সেন শিক্ষার শেষে আমেরিকার জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানির উচ্চ বেতনের চাকরি পায়ে ঠেলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় ফিরে আসেন।
সেই মানুষটির জীবনের শেষ অধ্যায়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালায়ে স্বাধীন ভারতের সবচেয়ে কলঙ্ক জনক ঘটনা ঘটে। যে ঘটনা প্রতীকী অর্থে-যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট এবং ভাবনার হত্যা। যে দেশ গঠনের সাধনা থেকে জাতীয় শিক্ষা পরিষদের মহিরুহের বীজ বপন করা হয়েছিল, ১৯৭০ সালে সেই কল্পবৃক্ষের গোড়ায় কুঠারঘাত করা হয়েছিল।
চিনের তথাকথিত সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রতিধ্বনিতে কলকাতা সহ রাজ্যের কিছু অংশে এক চরম অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছিল। চিনে ১৯৭৩ সালে "গ্যাং অফ ফোরের" কবলে চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যেই এই কালচারাল রেভলিউশনের সমাপ্তি হয়েছিল। কিন্তু তার আগেই এই ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষামন্দিরের প্রাঙ্গনে বলিদান হলেন অধ্যাপক গোপাল চন্দ্র সেন।
গোপাল চন্দ্র সেনের একমাত্র অপরাধ ছিল তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ওই অস্থির সময়েও পড়াশুনা আর পরীক্ষা পরিচালনার ব্যবস্থা করেছিলেন। সেই কারণে তাকে ৩০ ডিসেম্বর ১৯৭০ সালে বিশ্ববিদ্যালয় পরিসরে পিছন থেকে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়েছিল। লজ্জার বিষয় এতবড় পাপের পরেও হত্যাকারী দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। একজনেরও কোন শাস্তি হয়নি।
আজও সেই পাপস্খলন হয়নি, যে আদর্শে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ তৈরী হয়েছিল, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বিকাশ হয়েছিল, তার সঙ্গে "ভারত তেরে টুকরে হোঙ্গে" বা 'কাশ্মীর মাঙ্গে আজাদি'র কোন সুদূর যোগ নেই। শক্তিশালী বৈভবসম্পন্ন স্বদেশ তৈরী স্বপ্ন নিয়েই এই দেশমাতৃকার পূজাবেদী তৈরী হয়েছিল।
প্রতিকূলতা যতই থাক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এই দেশপ্রেমের লড়াই লাগাতার চলেছে। গোপাল চন্দ্র সেনের বলিদান ব্যার্থ হয়নি। যেদিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্বামী বিবেকানন্দের ছবি ছিঁড়ে ফেলে পদদলিত করা হয়েছিল, তার ঠিক পরের দিনই স্বতঃস্ফূর্তভাবে শত শত ছাত্রছাত্রী প্রতিবাদে পথে নেমেছিলেন।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় আবার সারা বিশ্বে সবার সেরা হয়ে উঠবে, বাম নকশালদের ধুলোয় মিশিয়ে শূন্য থেকে মহাশূন্যে বিলীন করে দিয়ে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্থান জাতীয়তাবাদ চিন্তনের মাধ্যমে, সেই জাতীয়তাবাদ আবার প্রতিষ্ঠা হবে ।
ভারত মাতা কি জয়
বন্দে মাতরম
জয় হিন্দ
#MakeJadavpurUniversityGreatAgain