পশ্চিমবঙ্গ দিবস বিস্মৃত ইতিহাস ও আমাদের অস্তিত্বের সংকট
ভারতের প্রায় প্রতিটি রাজ্যেরই একটি নির্দিষ্ট 'রাজ্য দিবস' বা প্রতিষ্ঠা দিবস রয়েছে। ব্যতিক্রম শুধু পশ্চিমবঙ্গ। কিন্তু কেন? পশ্চিমবঙ্গবাসী হিসেবে কি আমাদের কোনো আত্মগর্ব নেই, নাকি যে রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের মধ্য দিয়ে এই রাজ্যের জন্ম হয়েছিল, তা আমরা সম্পূর্ণ ভুলে বসে আছি? দুর্ভাগ্যবশত, আংশিকভাবে হলেও দুটি কথাই সত্য। আজ পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া রাজ্যগুলোর একটি। কিন্তু আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য বিহারও তো অনগ্রসরতার মুখোমুখি; তবুও সেখানে প্রতি বছর অত্যন্ত মর্যাদার সাথে বিহার দিবস পালিত হয়। উৎসব ও অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তারা রাজ্যের গৌরবময় ঐতিহ্য ও মহান ব্যক্তিত্বদের স্মরণ করেন, একজন বিহারী হিসেবে গর্ববোধ করেন। তাহলে আমরা কেন বছরের একটি দিন 'পশ্চিমবঙ্গ দিবস' হিসেবে উদযাপনের অধিকার পাব না?
ভারতের অন্যান্য রাজ্যে সাধারণত রাজ্য প্রতিষ্ঠার দিনটিকেই রাজ্য দিবস হিসেবে পালন করা হয়—যেমন মহারাষ্ট্রে ১ মে, কর্ণাটকে ১ নভেম্বর কিংবা রাজস্থানে ৩০ মার্চ। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, পশ্চিমবঙ্গের প্রকৃত প্রতিষ্ঠা দিবসটি কবে?
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ও দেশভাগের অনিবার্য পরিণতি
ব্রিটিশ শাসনের শেষলগ্নে দেশভাগ ছিল এক অনভিপ্রেত অথচ ঐতিহাসিক বাস্তবতা। বিংশ শতাব্দীর সূচনা থেকেই ভারতের জাতীয়তাবাদী ও বিপ্লবী আন্দোলনকে দুর্বল করতে ব্রিটিশ শাসকেরা সুকৌশলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বীজ বপন করে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনা থেকে শুরু করে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে জনসংখ্যাভিত্তিক অন্যায্য প্রতিনিধিত্ব প্রদান—এই সমস্ত পদক্ষেপ তৎকালীন বঙ্গদেশে মৌলবাদী মানসিকতাকে উস্কে দেয়। ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগ যখন পৃথক পাকিস্তানের প্রস্তাব গ্রহণ করে, তখন জাতীয় স্তরের শীর্ষ নেতৃত্ব একে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে কলকাতার রাস্তায় প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের (Direct Action Day) রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা এবং নোয়াখালীর ভয়াবহ হিন্দু গণহত্যার পর, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাম্প্রদায়িকতার কারণে দেশভাগ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
যখন মুসলিম লীগ সম্পূর্ণ বঙ্গকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানায়, তখন বাংলার জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব ও বুদ্ধিজীবী সমাজ তার তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁরা অবিভক্ত বাংলার অমুসলিম অধ্যুষিত অংশটিকে নিয়ে ভারতের অধীনে একটি নতুন রাজ্যের দাবি তোলেন, যার নাম দেওয়া হয় 'পশ্চিমবঙ্গ'। যুক্তি ছিল অত্যন্ত সরল—যে যুক্তিতে ২৪% মুসলিম জনসংখ্যার জন্য পৃথক রাষ্ট্রের দাবি করা হচ্ছে, সেই একই যুক্তিতে তৎকালীন বাংলার ৪৫% অমুসলিম জনসংখ্যা কেন পাকিস্তানের অধীনে থাকতে বাধ্য হবে? 'অমৃতবাজার পত্রিকা'র তৎকালীন এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, প্রায় ৯৮.৩% অমুসলিম অধিবাসী নিজেদের জন্য একটি পৃথক রাজ্যের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ—আপামর বাঙালি এই আন্দোলনে শামিল হন।
১৯৪০ সালের ২৩-২৪ মার্চ অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশন ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই অধিবেশনে বিখ্যাত 'লাহোর প্রস্তাব' পাস হয়। এর মাধ্যমে মুসলিমরা প্রথমবার ভারত বিভাগের দাবি ত্যাগ করে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করে। এই নীতিতেই ভারতকে দ্বিখণ্ডিত করা হয়।
কীভাবে গঠন হয় পশ্চিমবঙ্গ দিবস?
১৯৪৭ সালের ২০ জুন বঙ্গীয় আইন পরিষদে অবিভক্ত বঙ্গ প্রাদেশিক আইনসভা অখণ্ড বঙ্গ ভাগের বিষয়টি উত্থাপিত হয়।বঙ্গভাগের পক্ষে বড় অংশের ভোট পড়ায় দু’টুকরো হয় বাংলা। এই ভোটাভুটির ফলাফলের ভিত্তিতেই পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হয়, পূর্ববঙ্গ (যদিও প্রথমে তা পূর্ব পাকিস্তান ও পরে বাংলাদেশ হয়) যুক্ত হয় পাকিস্তানের সঙ্গে। এই বাংলা ভাগের দু’মাসের মাথায় ইংরেজদের পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয় ভারত। ২০ জুনের সেই সিদ্ধান্তকে সামনে রেখেই পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন করা হয়। সৃষ্টি হয়েছিল বাঙালি হিন্দুর একমাত্র স্বভূমি অথবা হোমল্যান্ড পশ্চিমবঙ্গের। পশ্চিমবঙ্গের স্রষ্টা ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের এই অবদান কোনওদিনও ভোলা সম্ভব নয়। ওনার প্রচেষ্টার কারণে সৌভাগ্যক্রমে আজ আমরা, বিশেষত বাঙালি হিন্দুরা এই মহান দেশ ভারতবর্ষের নাগরিক হওয়ার সম্মান পেয়েছি এবং মাথা উঁচু করে সসম্মানে বেঁচে আছি। নয় তো গোটা বঙ্গভমি চলে যেতো পাকিস্তানের খপ্পরে।
অবশেষে, তীব্র গণ-আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশ শাসকেরা আইনসভায় ভোটাভোটির মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বঙ্গীয় আইনসভার (Bengal Legislative Assembly) অমুসলিম সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে ভারতের অংশ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য গঠনের প্রস্তাবটি সুনিশ্চিত হয়। অবসান ঘটে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার, জন্ম নেয় আমাদের এই পশ্চিমবঙ্গ।
বর্তমানের সংকট ও যুবসমাজের দায়িত্ব
আজ বঙ্গে শ্যামাপ্রসাদের অনুপ্রেরণায় জাতীয়তাবাদী সরকার গঠন হয়েছে। কিন্তু গত ৭৯ বছরের যুক্তফ্রন্ট, কংগ্রেস, বামফ্রন্ট এবং তৃণমূলের শাসনে পশ্চিমবঙ্গ এক গভীর অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। সাত দশক আগে যে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সাম্প্রদায়িক চিন্তাধারা দেশভাগের জন্ম দিয়েছিল, বিগত সরকারের ভিন্ন রূপে পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্যনিয়ন্তা হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। ১৯৪০-এর দশকে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে যে বিভাজনের রাজনীতি শুরু হয়েছিল তা যেন ক্রমে ক্রমে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। যে অপশক্তি দেশকে দ্বিখণ্ডিত করেছিল এখন পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে, আগামী দিনে কোনও চরম বিপর্যয় ঘটবে না—তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। দেশভাগ যে ধর্মীয় মেরুকরণের হাতিয়ার ছিল এবং হিন্দু অস্তিত্বের একমাত্র হোমল্যান্ড ছিল তাকে রক্ষা করাই আজকের বাংলায় বড় কাজ। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের মুসলিমলীগের নেতারা আজ বেচে না থাকলেও তাঁদের উত্তরসূরীরা রয়েছেন। মুসলিমলীগের মতো জেহাদি অপশক্তি বারবার জামা পালটে কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস এবং বামরাজনৈতিক দলের সঙ্গে মিলে মিশে বঙ্গকে ইসলামী শাসনের দিকে নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা করে চলেছে। বিগত টানা ১৫ বছর তৃণমূল শাসন পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুদের অস্তিত্বকে সঙ্কটের মধ্যে নিয়ে গিয়েছে। এখনকার বাংলাদেশের জামাতি শাসন আর তৃণমূল শাসন যেন সমান্তরাল ভাবে চলছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর প্রথম পশ্চিমবঙ্গে এই জাতীয়তাবাদী সরকার এসেছে। ফলে হিন্দু হোমল্যান্ড আরও সক্রিয় হবে এই আশাই মানুষের একমাত্র প্রত্যাশা।
আত্মপরিচয় হারাবে না মাথা উঁচু করে বাঁচবে
এটি কোনও কল্পনা বা অমূলক আশঙ্কা নয়, বরং এক কঠোর ও নির্মম বাস্তব। কেবল কয়েক বছরে একবার ভোট দিয়ে, ফেসবুকে কয়েকটি লাইক-কমেন্ট করে কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি আওড়ানো বুদ্ধিজীবীদের সমালোচনা করে এই ক্ষতি এড়ানো যাবে না। বর্তমান প্রজন্ম যদি আজ সচেতন না হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে। আমাদের সামনে আজ দুটি মাত্র পথ খোলা—হয় আত্মপরিচয় হারিয়ে পরনির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকা, না হলে নিজের অধিকার ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করে নিজ ভূখণ্ডে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা।
পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টি হয়েছিল আপনার ও আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। আর তাই এই রাজ্যকে রক্ষা করার দায়িত্বও আমাদেরই। আজ তরুণ ও যুবসমাজের একটি বড় অংশই জানে না, কত বড় সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে এই রাজ্যের সৃষ্টি হয়েছিল। বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সেই ইতিহাস জানা অত্যন্ত জরুরি।
এই ঐতিহাসিক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই আগামী ২০ জুন পালিত হতে চলেছে 'পশ্চিমবঙ্গ দিবস'। আপনার নিজ অঞ্চলে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিংবা কর্মক্ষেত্রে এই দিনটিকে স্মরণ করুন। আসুন, ইতিহাসের সত্যকে ধারণ করে পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে শামিল হই।
কলমে--- ধর্মাবতার